কক্সবাজার সংবাদদাতা published: ০৭ মার্চ, ২০২৬, ১১:৫৪ পিএম

কক্সবাজার শহরে আবারও একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা পুরো এলাকায় চরম উদ্বেগ, আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। কক্সবাজার শহরের বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় সনাতন ধর্মাবলম্বী গণেশ (৩৫) নামের এক ব্যক্তিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহতের পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ার কারণেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত গণেশ পেশায় একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ ছিলেন এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তিনি তার পরিবার নিয়ে কক্সবাজার শহরের বিজিবি ক্যাম্প এলাকার পাশে বসবাস করতেন। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, কিছুদিন ধরে ওই এলাকায় কয়েকজন বখাটে যুবক ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন অজুহাতে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে আসছিল। অনেকেই ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পান না।
নিহত গণেশের স্ত্রী জানান, জিদান নামের এক যুবক প্রায় প্রতিদিনই তাদের বাড়িতে এসে চাঁদা দাবি করত। তিনি বলেন, “অনেক দিন ধরেই সে আমার স্বামীর কাছে টাকা চাইত। না দিলে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখাত। ঘটনার দিনও সে চাঁদা নিতে আসে। কিন্তু সেদিন কোনো কারণে টাকা দিতে একটু দেরি হওয়ায় সে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।”
তিনি আরও জানান, একপর্যায়ে কথা কাটাকাটির ঘটনা ঘটে এবং হঠাৎ করেই অভিযুক্ত জিদান ধারালো অস্ত্র বের করে গণেশের ওপর এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে। এতে গণেশ গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে দ্রুত উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় নিহতের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন এবং দ্রুত খুনির গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসী চক্রের দৌরাত্ম্য থাকলেও অনেক সময় তা যথাযথভাবে দমন করা হয়নি।
ঘটনার পরপরই স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এলাকাবাসী বলেন, কক্সবাজার শহরে দিন দিন অপরাধের মাত্রা বাড়ছে। বিশেষ করে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং চাঁদাবাজি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব (ক্রাইম) এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঘটনাটি ইতোমধ্যে তাদের নজরে এসেছে এবং বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, “ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। অভিযুক্ত জিদানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তাকে দ্রুত গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ কাজ করছে।”
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পর থেকে অভিযুক্তকে ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সচেতন নাগরিক মহল বলছে, কক্সবাজার একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন শহর হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য পর্যটক এখানে ভ্রমণে আসেন। কিন্তু সম্প্রতি শহরে কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় শহরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
তারা মনে করেন, যদি দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে এবং এতে শহরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি পর্যটন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এলাকাবাসী ও সচেতন নাগরিকরা কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপারের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়েছেন—শহরের কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করে দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হোক। পাশাপাশি এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের মতে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তাহলেই কক্সবাজারকে একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও অপরাধমুক্ত শহর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।