বাংলাদেশ, রবিবার, এপ্রিল ১৯, ২০২৬
logo

উৎসবের আনন্দ যখন স্মৃতির দুয়ারে: ঈদের সকালে কবরস্থানে প্রিয়জনের খোঁজে


নিজস্ব প্রতিবেদক published:  ২১ মার্চ, ২০২৬, ০৯:১৬ পিএম

উৎসবের আনন্দ যখন স্মৃতির দুয়ারে: ঈদের সকালে কবরস্থানে প্রিয়জনের খোঁজে

ভোর থেকেই চারদিকে সাজ সাজ রব। নতুন জামার সুবাস আর আতরের ঘ্রাণে ম ম করছে চারপাশ। ঈদগাহে নামাজের সারি, ছোটদের কোলাহল আর নামাজ শেষে চিরচেনা সেই কোলাকুলি—সব মিলিয়ে এক আনন্দঘন পরিবেশ। 'ঈদ মোবারক' ধ্বনিতে মুখরিত আকাশ-বাতাস। কিন্তু এই উৎসবের জোয়ারের মাঝেই একদল মানুষের গন্তব্য হয় ভিন্ন। তারা বাড়ির দিকে না গিয়ে ধীর পায়ে হাঁটা দেন কবরের শান্ত পথের দিকে।



ঈদের চিরচেনা আনন্দের মাঝেও এই দৃশ্যটি প্রতিবছরই চোখে পড়ে। যেখানে সবাই বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে ভিড় জমান, সেখানে একদল মানুষ একা হয়ে যান। তারা জনস্রোত থেকে আলাদা হয়ে নিরিবিলি কবরস্থানের পথ ধরেন। প্রতিটা পা ফেলার সময় তাদের মনে পড়ে যায় সেই মানুষগুলোর কথা, যাদের ছাড়া একসময় ঈদ কল্পনাই করা যেত না। আজ তারা আছেন, উৎসব আছে, কিন্তু সেই চিরচেনা মানুষগুলো নেই।



কবরস্থানের সীমানায় পা রাখতেই পাল্টে যায় পারিপার্শ্বিক দৃশ্যপট। বাইরের কোলাহল যেন মুহূর্তেই থেমে যায় এক গভীর নিস্তব্ধতায়। সেখানে নেই কোনো ঈদের গান, নেই কোনো হাসি-ঠাট্টা। আছে শুধু সারি সারি কবর আর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। মানুষগুলো যখন তাদের পরিচিত কবরটির সামনে গিয়ে দাঁড়ান, তখন সময় যেন থমকে যায়।


কোনো কথা নেই, শুধু মাটির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা। স্মৃতির পাতায় তখন ভেসে ওঠে ফেলে আসা সেই দিনগুলো। কেউ মনে করেন বাবার সেই স্নেহমাখা ডাক, কেউবা মায়ের হাতের সেমাইয়ের স্বাদ। কেউ হয়তো খুঁজছেন তার সেই প্রিয় বন্ধু বা জীবনসঙ্গীকে, যার হাত ধরে গত ঈদেও ঘুরে বেড়িয়েছেন। আজ তারা মাটির নিচে এক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, আর উপরে দাঁড়িয়ে স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন তাদের প্রিয়জনরা।



কবরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখের কোণে যখন জল জমে, তখন কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। দুহাত তুলে পরম করুণাময়ের কাছে একটাই আর্জি— "আল্লাহ, তাকে মাফ করে দিন... তাকে জান্নাত দিন।" এই দোয়ার মাঝেই যেন খুঁজে পাওয়া যায় আত্মার শান্তি। চারপাশে তাকালে দেখা যায়, দৃশ্যটি একা একজনের নয়; আরও অনেকেই এসেছেন। সবার চোখে একই শূন্যতা, সবার হৃদয়ে একই হারানোর বেদনা। কেউ আগরবাতি জ্বালছেন, কেউবা কবরের ওপর জমে থাকা শুকনো পাতাগুলো সরিয়ে দিচ্ছেন পরম মমতায়।



কবরস্থান থেকে ফিরে আবার সবাইকে হাসিমুখে বরণ করে নিতে হয়। ফিরতে হয় মানুষের মাঝে, খাবারের টেবিলে, আড্ডার আসরে। কিন্তু উৎসবের এই জাঁকজমকের আড়ালে বুকের ভেতরটা জানে—একটা জায়গা চিরতরে খালি হয়ে গেছে। সেই মানুষটি নেই বলে ঈদের আনন্দটা যেন পূর্ণতা পায় না।


উৎসব মানেই তো প্রিয়জনদের সাথে থাকা। আর যাদের প্রিয়জনরা পরপারে, তাদের কাছে ঈদের প্রকৃত আনন্দ যেন এই কবর জিয়ারত আর স্মৃতি রোমন্থনেই লুকিয়ে থাকে। দিনশেষে এটাই চরম সত্য—আনন্দের মিছিলেও কিছু মানুষ বয়ে বেড়ান এক আজন্ম বিরহ, যা কেবল কবরের পাশে দাঁড়িয়েই কিছুটা লাঘব হয়।