গত ১১ থেকে ১৬ মার্চ। মাত্র ছয় দিন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে আইসিইউর অভাবে ১৮টি শিশু মারা গেল। সংখ্যাটা হয়তো খবরের কাগজের পাতায় স্রেফ একটা পরিসংখ্যান। কিন্তু ১৮টি পরিবারের কাছে এটি সারা জীবনের কান্না। বাস্তবতা হলো, এই মৃত্যুগুলো কোনো দুরারোগ্য ব্যাধির কারণে হয়নি। মৃত্যুগুলো হয়েছে চরম প্রশাসনিক অবহেলায়।
বিষয়টা একটু তলিয়ে দেখা যাক। রামেকের শিশু আইসিইউ প্রধান ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানাচ্ছেন, সেখানে বেড আছে মাত্র ১২টি। আর প্রতিদিন সিরিয়ালে থাকছে ৪০ জনের বেশি মুমূর্ষু শিশু। অথচ রামেক থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে বহরমপুর এলাকায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক শিশু হাসপাতালটির ফটকে ঝুলছে বিশাল এক তালা। ভেতরে ৫৬টি অত্যাধুনিক আইসিইউ (NICU/PICU) বেড ধুলোয় নষ্ট হচ্ছে। ‘অর্গানোগ্রাম’ বা জনবল কাঠামো পাসের অজুহাতে বছরের পর বছর ভবনটি বুঝে নিচ্ছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর সোজা অর্থ হলো—প্রশাসনের কাছে ১৮টি শিশুর প্রাণের চেয়ে একটি কাগজের ফাইলের ওজন অনেক বেশি।
২০১২ সাল থেকে ফায়ার সার্ভিস মোড়ে একটি জরাজীর্ণ ভাড়া বাড়িতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে শিশু হাসপাতালের কার্যক্রম। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ জনবল কাঠামো তৈরি করতে না পারা চরম অদক্ষতার প্রমাণ। অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট হচ্ছে, চুরি যাচ্ছে। এটি শুধু অর্থের অপচয় নয়, এটি বরেন্দ্র অঞ্চলের লাখো মানুষের সাথে এক ধরনের প্রতারণা।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) ও ১৮(১) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে নাগরিকের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের (UNCRC) ২৪ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বাক্ষরকারী হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিটি শিশুর উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বাধ্য। একটি প্রস্তুত হাসপাতাল থাকতেও আইসিইউর অভাবে শিশুর মৃত্যু তাই স্রেফ কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি মানবাধিকার ও সাংবিধানিক অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
এই অচলাবস্থা ভাঙতে এখন শীর্ষ পর্যায়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া বিকল্প নেই। আমরা জানি, বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কতটা আন্তরিক। একই সাথে, রাজশাহীর মাটি ও মানুষের নেতা, মাননীয় সংসদ সদস্য ও ভূমিমন্ত্রী মহোদয়ের হাত ধরে এই অঞ্চলের দৃশ্যমান অনেক উন্নয়ন হয়েছে। তাদের এবং মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষের একটাই দাবি—জরুরি নির্বাহী আদেশে অ্যাডহক ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ দিন। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই ৫৬টি আইসিইউ বেড মুমূর্ষু শিশুদের জন্য উন্মুক্ত করুন।
লাল ফিতার জট খোলার চেয়ে শিশুর জীবন বাঁচানো অনেক বেশি জরুরি। বহরমপুর শিশু হাসপাতালের ওই তালাটা এখন আর শুধু একটা ভবনের তালা নয়, ওটা আমাদের প্রশাসনিক বিবেকের তালা। অবিলম্বে এই তালা ভাঙতে হবে। নইলে এমন প্রতিটি মৃত্যুর দায় আমাদের তাড়া করে ফিরবে।
শামীউল আলীম শাওন
লেখক, উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী
সভাপতি, ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ (ইয়্যাস)