বাংলাদেশ, রবিবার, এপ্রিল ১৯, ২০২৬

রাজকীয় নগরী হারাচ্ছে আজ পরিছন্নতার খ্যাতি

স্বপ্নের বাংলাদেশ বার্তাকক্ষ

পাভেল ইসলাম মিমুল

published: 05 October, 2025, 12:29 PM

রাজকীয় নগরী হারাচ্ছে আজ পরিছন্নতার খ্যাতি

সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন নগরী হিসাবে শুধু দেশেই নয়, একসময় আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃতি অর্জন করেছিল রাজশাহী মহানগরী। কিন্তু অভিভাবকহীন রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) এখন নগরবাসীর প্রয়োজনীয় সেবাও নিশ্চিত করতে পারছে না, নগরীকে দূষণমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন রাখতেও ব্যর্থ হচ্ছে। নগরীর ছোট থেকে বড় রাস্তা, গলিপথ থেকে হাঁটাপথ-সব জায়গা বেদখল হয়ে গেছে।


ছোট-বড় নালা-নর্দমা, ড্রেন উপচে ময়লা পানি ভাসাচ্ছে সড়ক ও বাসা-বাড়ি। যেখানে-সেখানে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ মহল্লাবাসী। তার ওপর বেড়ে চলা যানজটে প্রতিনিয়তই নাকাল হচ্ছে নগরীর মানুষ। পরিচ্ছন্ন নগরীর এমন বিবর্ণ চেহারায় ক্ষুব্ধ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা।


ভুক্তভোগীরা দৈনিক স্বপ্নের বাংলাদেশ পত্রিকাকে বলেন , এক বছর আগেও নগরীর সামগ্রিক চেহারা এতটা বিবর্ণ ও মলিন ছিল না। মেয়র, কাউন্সিলর নেই এক বছরের বেশি হয়ে গেছে। বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি কর্মকর্তাদের মেয়র ও কাউন্সিলরদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা মাসে একবারও কাউন্সিলর অফিসে যান না। নগরবাসীর কোনো সমস্যা সরাসরি শোনেন না। রাজশাহী মহানগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের কোথায় কী সমস্যা, তা জানারও চেষ্টা করছেন না দায়িত্বপ্রাপ্ত এসব সরকারি কর্মকর্তা। ওয়ার্ড কার্যালয়ে সাত দিন ঘুরেও কোনো কর্মকর্তার সাক্ষাৎ মেলে না।


নগরীর ভদ্রা এলাকার আরাফাত রহমান দৈনিক স্বপ্নের বাংলাদেশ পত্রিকাকে বলেন, ভদ্রা মোড়ের টাইলস লাগানো পুরো ফুটপাত দখল করে বসানো হয়েছে ফলের দোকান। এসব দোকানের ফলসম্ভার সাজিয়ে রাখা হচ্ছে মূল সড়কের আরও কিছু অংশ দখল করে। এতে পথচারীরা পথ চলতে গিয়ে নিয়মিত বিড়ম্বনায় পড়ছেন। ভদ্রা মোড়ের পূর্বাংশের পুরো ফুটপাত দখল করে বানানো হয়েছে আন্তঃজেলা বাস সার্ভিসের কাউন্টার। পথচারীরা কোনোভাবেই এই পথে চলাচল করতে পারে না।


এদিকে ভদ্রা মোড় থেকে রাজশাহী রেলস্টেশন পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার ফুটপাতের পুরোটাই দখল করে রেখেছেন ভাঙারি ব্যবসায়ীরা। এই সড়কের রেশম ভবনের দেওয়াল ঘেঁষে বিস্তৃত ফুটপাত দখলে নিয়ে বসানো হয়েছে ২০টির বেশি অস্থায়ী দোকান। সিরোইল বাস টার্মিনালের সামনের বড় সড়কটির ওপর সারিবদ্ধভাবে বাস রেখে চলাচলের পথকে রুদ্ধ করে রাখা হচ্ছে। রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের প্রবেশদ্বারের পুরোটাই দখল করে বসানো হয়েছে ফলসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান। সিরোইলের ঢাকা বাস কাউন্টারগুলো থেকে রেশম কারখানার দেয়াল ঘেঁষে পুরো ফুটপাতের ওপর টিনের ছাউনি দিয়ে বসেছে ৫০টির বেশি দোকান।


এই সড়কের উত্তরাংশে সারি সারি বাস রেখে সড়কের অর্ধেকের বেশি জায়গা ব্লক করে রাখা হলেও সিটি করপোরেশন সরানোর উদ্যোগ নিচ্ছে না। অন্যদিকে নগরীর প্রাণকেন্দ্র সাহেববাজারের এক ইঞ্চি ফুটপাতও দখলের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। জিরো পয়েন্ট থেকে সোনাদিঘির মোড় ছাড়াও মালোপাড়া থেকে সোনাদিঘি পর্যন্ত ফুটপাতের ওপর বসছে শত শত দোকান। সাহেববাজারের সড়কের অর্ধেকের বেশি জায়গায় অবৈধ দোকানে গিজগিজ করছে। এ এলাকায় ফুটপাত দিয়ে পথচারীর দুই কদমও হেঁটে চলার উপায় নেই। নগরীজুড়ে এভাবে ফুটপাতের গণদখল পরিস্থিতিতে পদে পদে বিড়ম্বনায় পড়ছেন নগরবাসী।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। উচ্ছেদের আগে আমরা মাইকিং করে ফুটপাত থেকে দোকানপাট সরিয়ে নিতে অনুরোধ করছি। কেউ নিজেরা সরিয়ে না নিলে আমরা উচ্ছেদ অভিযান করছি।


অন্যদিকে নগরীজুড়ে যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমে থাকছে অনেকদিন ধরে। নগরীর সিটি বাইপাসের বহরমপুর, হড়গ্রাম, বুলনপুর, বড়কুঠি, শালবাগান, সাগরপাড়া, লক্ষ্মীপুর, উপশহর, সপুরা, তেরখাদিয়া প্রভৃতি এলাকায় মোড়ে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমে থাকছে কয়েকদিন ধরে।


এদিকে নগরীজুড়ে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যানজট হচ্ছে। সরেজমিন দেখা যায়, রেলগেট বহরমপুর মোড় পর্যন্ত পুরো গ্রেটার রোডে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যানজট লেগে থাকছে। ঘোষপাড়া মোড় থেকে লক্ষ্মীপুর মোড় হয়ে ঝাউতলা পর্যন্ত ঘণ্টব্যাপী যানজটে আটকা থাকছে পথচলতি মানুষ। এ এলাকায় রয়েছে অনেক প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক। রয়েছে রাজশাহী মেডিকেল হাসপাতাল। বিশেষ করে মেডিকেল হাসপাতালের সামনের সড়কের তিন ভাগের দুই ভাগই দখল হয়ে রয়েছে ভ্রাম্যমাণ দোকান আর রোগীর অপেক্ষায় থাকা প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সের কারণে। এ যানজটের কারণে মুমূর্ষু রোগী নিয়ে সহজে হাসপাতালে প্রবেশ করা যায় না।


রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. জামাত খান বলেন, নগরীতে প্রয়োজনের তুলনায় দশগুণ বেশি অটো রিকশা চলাচল করছে। এ সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি হবে। প্রতিদিন অনুমোদনবিহীনভাবে অটোরিকশা সড়কে নামছে। যানজট তৈরি হচ্ছে মূলত অটোরিকশার কারণে আর পুরো ফুটপাত অবৈধ দখলের কারণে। নগরীতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান আগে যেভাবে চলত, এখন তা গতিহীন হয়ে পড়েছে।


রাসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন দৈনিক স্বপ্নের বাংলাদেশ পত্রিকাকে বলেন, যানজট দেখার বিষয়টি নগর পুলিশের ওপর ন্যস্ত। ময়লা ও বর্জ্য অপসারণের কাজগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবেই হচ্ছে। কোথাও বর্জ্য পড়ে থাকলে এবং আমরা খবর পেলে তাৎক্ষণিক অপসারণের উদ্যোগ নিয়ে থাকি। ফুটপাত দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

National